Introduction

বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে কৃষিনির্ভর। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো’র প্রভিশনাল হিসাবানুযায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষির অবদান ১১.৩৮%। শিল্প ও সেবা খাতের প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও কৃষি খাতের পরোক্ষ অবদান রয়েছে। এছাড়া লেবার ফোর্স সার্ভে ২০২২ অনুযায়ী দেশের মোট শ্রমজীবীর ৪৫.৩৩% প্রত্যক্ষভাবে কৃষির সাথে জড়িত। পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদন, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সর্বোপরি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে কৃষি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। এমনকি পরিবেশ বিপর্যয় ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায়ও কৃষির ভূমিকা অপরিসীম। খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি নিশ্চিত করতে উন্নত প্রযুক্তি নির্ভর কৃষি ব্যবস্থার বিকল্প নেই। দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষির চলমান অগ্রযাত্রাকে সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারের কৃষিবান্ধব নীতিমালা ও উদ্যোগের ফলে দেশ এখন খাদ্য শস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কৃষি খাতের উন্নয়নের কারণে দারিদ্র্য বিমোচন এবং দেশের বিস্তৃত গ্রাম বাংলার জীবনমানের উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব হয়েছে। টেকসই উন্নয়নের অন্যতম লক্ষ্য ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত সমাজ গঠনে কৃষি খাত সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখতে পারে। এ লক্ষ্যে কৃষি খাতে পর্যাপ্ত ঋণ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষি ঋণ বিভাগ প্রতি অর্থবছরে দেশের কৃষি ও পল্লী ঋণ নীতিমালা ও কর্মসূচি প্রণয়ন করে থাকে।

কৃষকবান্ধব ও দারিদ্র্য বিমোচনে টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এ নীতিমালার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। সরকারের কৃষিবান্ধব নীতির সাথে সঙ্গতি রেখে গত অর্থবছরের নীতিমালার প্রধান প্রধান বিষয় ঠিক রেখে চলতি ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে ৩৫,০০০ কোটি টাকা কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে (পরিশিষ্ট-‘খ’)। উল্লেখ্য, এ নীতিমালায় বেশকিছু নতুন বিষয় সংযোজন করা হয়েছে যেমন: ছাদকৃষিতে অর্থায়ন, নিজস্ব নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কৃষি ঋণ বিতরণের হার ৫০ শতাংশে বৃদ্ধি, কৃষি ও পল্লী ঋণের পরিধি ও আওতা বৃদ্ধি, কতিপয় নতুন শস্য ও ফসলের ঋণ নিয়মাচার অন্তর্ভুক্তি, মৎস্যসম্পদ খাতে ঋণ বিতরণের উদ্দেশ্যে নতুন উপখাত সংযোজন, ঋণ নিয়মাচারে একর প্রতি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি, ঋণ পরিশোধের সময়সীমা যৌক্তিকীকরণ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণ কার্যক্রমে ব্যাংকসমূহের করণীয় সম্পর্কে এ নীতিমালায় বিস্তারিত নির্দেশনা রয়েছে। নীতিমালাটি কৃষির কাঙ্খিত উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষকদের অনুকূলে ঋণ প্রবাহ বৃদ্ধি, দারিদ্র্য বিমোচন, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির নেতিবাচক প্রভাব কাটিয়ে দেশের অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত অবদান রাখবে।

সরকারের রাজস্বনীতিসহ বিভিন্ন উন্নয়নমুখী কার্যক্রম এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সময়োপযোগী মুদ্রানীতি এবং কৃষি খাতে প্রণোদনামূলক পুন:অর্থায়ন স্কিম চালুর ফলে বিগত বছরগুলোতে এবং কোভিড-১৯ অতিমারি উত্তর চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব সত্ত্বেও সাম্প্রতিক অর্থবছরে জিডিপি’র কাঙ্খিত প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। বৈশ্বিক কারণে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চলতি অর্থবছরের নতুন মুদ্রানীতিতে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। খাদ্য সরবরাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে নিত্যপণ্যের বাজারমূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখার জন্য কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধির নিমিত্ত এ খাতে প্রণোদনামূলক পুনঃঅর্থায়ন স্কিম চালু রয়েছে। কৃষির অগ্রাধিকার খাতে বিশেষ করে আমদানি বিকল্প শস্য খাতে ৪% রেয়াতি সুদহারে ঋণ বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ফলে কৃষক পর্যায়ে উৎপাদন ব্যয় বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। দেশের শিল্প-কারখানা প্রসারের কারণে আবাদি জমির পরিমাণ হ্রাস পাওয়া সত্ত্বেও উন্নত কৃষি প্রযুক্তির উদ্ভাবন এবং এর সদ্ব্যবহার বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত কৃষি ঋণ সরবরাহ এবং সর্বোপরি কৃষকদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় দেশের কৃষি পণ্য উৎপাদনে ধারাবাহিক বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে চা, পাট, হিমায়িত মাছ, সবজি, ফল, ইত্যাদি কৃষি পণ্য রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। এরই ধারাবহিকতায় ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের কৃষি ও পল্লী ঋণ নীতিমালা ও কর্মসূচি গ্রামীণ অর্থনীতিতে কৃষি খাতের পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক অন্যান্য কর্মকা- সম্প্রসারিত করে কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক হবে।